রূপালী প্রতিবেদক, যশোর
চার হাজার একশ’ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ কাজের সাড়ে ৫ বছরে অগ্রগতি মাত্র ৪-৫ শতাংশ। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক অস্বাভাবিক ধীরগতি, সর্বোপরি জমি অধিগ্রহণ কাজে জটিলতার কারণে একপ্রকার থমকে আছে এ মেগা প্রকল্প। মহাসড়কটি মেগা প্রকল্পের আওতায় যাওয়ার পর থেকে এর নিয়মিত সংস্কার কাজও বন্ধ আছে। ফলে মহাসড়কটি এখন ভেঙেচুরে খানাখন্দ আর ধুলাবালিতে মানুষের দুর্ভোগ এবং মৃত্যুফাঁদে পরিণত হয়েছে।
একাধিক সূত্রের তথ্যমতে, যশোর-ঝিনাইদহ মহাসড়ক ৬ লেনে উন্নীতকরণ মেগা প্রকল্প ২০২০ সালের ২৪ নভেম্বর একনেকের সভায় অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রকল্পের কাজ যশোরের চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার মুরাদগড়, মুরাদগড় থেকে কালীগঞ্জ এবং কালীগঞ্জ থেকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল- তিনটি লটে বিভক্ত। চাঁচড়া চেকপোস্ট থেকে ঝিনাইদহ কেন্দ্রীয় বাসটার্মিনাল পর্যন্ত ৪৭ দশমিক ৪৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে এ প্রকল্পে ব্যয় বরাদ্দ ৪ হাজার একশ’ কোটি টাকা। ওয়েস্টার্ন ইকোনমিক করিডোর (উইকেয়ার) ফেজ-১ এর এই কাজ বাস্তবায়নের ভার ন্যস্ত সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিপ্ততরের ওপর।
এই প্রকল্প বাস্তবায়নে ওই মহাসড়কের দুই পাশ থেকে ২০২৩ সালের শেষ এবং ২০২৪ সালের প্রথম দিকে ছোটবড় ২ হাজার ৫২৭টি বিভিন্ন প্রজাতির গাছ সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাটা হয়। এর মধ্যে মহাসড়কের যশোর অংশে ২ হাজার ৩১২টি এবং বাকি গাছ ছিল ঝিনাইদহ অংশে। এসব গাছের মধ্যে মেহগনি, শিশু ও রেইন্ট্রিসহ বিভিন্ন প্রজাতির মূল্যবান প্রাচীন গাছ ছিল। সূত্রমতে, মহাসড়কটির মূল লেন হবে ৪টি। আর ধীরগতির যানবাহন চলাচলের জন্য দুই পাশে দুইটি সার্ভিস লেন নির্মাণের সিডিউল রয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণের কথা রয়েছে একটি রেলওয়ে ওভারপাস, ৮টি ফুটওভারব্রিজ, গাড়ি পারাপারের ৫টি ভেহিকুলার ওভারপাস, ৪টি বড় সেতু, ৫৫টি কালভার্ট ও একটি ফ্লাইওভার।
সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের (২০২৬) জুনে এ প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা। সে অনুযায়ী হাতে সময় আছে মাত্র দুই মাস। কিন্তু এই সাড়ে ৫ বছর অতিবাহিত হলেও কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪-৫ শতাংশ। অনুসন্ধানে জানা গেছে, একটি সেতুর গার্ডার, কয়েকটি কালভার্ট ও ঝিনাইদহ শহরের বাইপাসের চুটলিয়া মোড়ে ফ্লাইওভারের আংশিক কাজ হয়েছে মাত্র। কিন্তু এখন পর্যন্ত মূল সড়কের কাজই শুরু হয়নি। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক অস্বাভাবিক ধীরগতি, সর্বোপরি জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় এ মেগা প্রকল্পের কাজ থমকে আছে বলে মিলেছে তথ্য।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে জমি অধিগ্রহণ। প্রকল্পভুক্ত মহাসড়কের দুই পাশে ৩০৪ একর জমি অধিগ্রহণের কথা। কিন্তু জমির মালিকদের ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তিতে বিলম্ব এবং সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ তা বুঝে না পাওয়ায় সাড়ে ৫ বছরে কাজের কাজ তেমন কিছুই হয়নি।
আবার মহাসড়কের দুই পাশের বিদ্যুতের খুঁটি সরাতে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি-ওজোপাডিকো এবং পল্লী বিদ্যুতের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে কাজে গতি হারাচ্ছে। এ ছাড়া গণপূর্ত বিভাগের কাছ থেকে মহাসড়কের দুই পাশের স্থাপনার মূল্য নির্ধারণের হিসাব পেতে ঢের দেরি হওয়ায় কাজে গতি পাচ্ছে না সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
যশোর-কুষ্টিয়া রুটে চলাচলকারী বাস ড্রাইভার রুবেল মিয়া বলেন, বিভিন্ন স্থানে রাস্তা খুঁড়ে দীর্ঘদিন ফেলে রাখায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এতে গাড়ি চলাচলে ধীরগতি এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া প্রায়ই গাড়ির যন্ত্রাংশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তিনি অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, ‘ভিক্ষের দরকার নেই, কুত্তা ঠ্যাকাও’। ওই রুটে চলাচলকারী দুই সরকারি কর্মচারী শামিমা আক্তার ও মিনা আফরোজ ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, ‘সারা রাস্তা ভাঙাচোরা। আমাদের ৬ লেন লাগবে না, শুধু চলাচলের ভালো রাস্তা চাই।
উইকেয়ার ফেজ-১ এর উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী নিলন আলী ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক-১ এসএম মোয়াজ্জেম হোসেন জানান, জমি অধিগ্রহণ কাজ তিন বছর ধরে চলমান। জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন না হওয়ায় আমরা নির্ধারিত জায়গায় কাজ শুরু করতে পারছি না। তবে যেসব স্থানে জমি বুঝে পেয়েছি, সেখানে আংশিক কাজ চলছে। সম্পূর্ণ জমি বুঝে পেলেই পুরোদমেই মূল কাজ শুরু হবে। যশোর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সিনিয়র সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট গুঞ্জন বিশ^াস জানান, মহাসড়কের দুই পাশের জমি, স্থাপনা, গাছগাছালির ক্ষতিপূরণ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ এবং তা বরাদ্দ হয়ে আসলে সেগুলো প্রদান করে কাজ শুরু করা যাবে। খুব দ্রুতই কাজ শুরু করা যাবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
ঝিনাইদহ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা সহকারী কমিশনার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মেহেদী হাসান জানিয়েছেন, ঝিনাইদহ-যশোর মহাসড়ক উন্নীতকরণ কাজ ঝিনাইদহ অংশ কালীগঞ্জ ও সদর-এ দু’অংশে বিভক্ত। এর মধ্যে কালীগঞ্জ অংশের ক্ষতিপূরণসহ অন্যান্য প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। সদর অংশের দাপ্তরিক প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। কিছু জটিলতা থাকলেও সেগুলো দ্রুত সমাধানের চেষ্টা চলছে। অল্প সময়ের মধ্যেই অধিগ্রহণ সম্পন্ন করে প্রকল্পের কাজ পুরোদমে শুরু করা যাবে বলে আশা ব্যক্ত করেন তিনি।