চট্টগ্রাম শহরের ব্যস্ততম জামালখান মোড়ের ‘ডা. এম এ হাসেম চত্বর’ কেবল একটি নাম নয়, বরং এটি বাংলার চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। যাঁর নামে এই চত্বর, তিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্ববাংলার প্রথম মুসলিম এম.বি চিকিৎসক।
১৮৯৪ সালে চট্টগ্রামের রাউজানে জন্ম নেওয়া ডা. এম এ হাসেম ১৯২৩ সালে কলকাতা বেঙ্গল মেডিক্যাল কলেজ থেকে মুসলিম ছাত্রদের মধ্যে প্রথম হয়ে এম.বি পাস করেন। মেধাবী এই চিকিৎসক তাঁর পরীক্ষার কৃতিত্বের জন্য স্বর্ণপদকও লাভ করেছিলেন। তবে কেবল ডিগ্রি নয়, তাঁর প্রকৃত পরিচয় ছিল একজন মানবতাবাদী চিকিৎসক হিসেবে।
কর্মজীবনের শুরুতে কলকাতা ও রেঙ্গুনে সেবা দিলেও ১৯২৯ সালে তিনি চট্টগ্রামে ফিরে আসেন। আন্দরকিল্লায় তাঁর চেম্বার ‘সুলতান মেডিক্যাল হল’ কালক্রমে সাধারণ মানুষের ভরসাস্থল হয়ে ওঠে। মানবসেবায় তাঁর অনন্য এক কৌশল ছিল—নিরক্ষরতা দূরীকরণ। দরিদ্র রোগীরা এলে তিনি বলতেন, "নিজের নাম দস্তখত করতে পারলে ফি নেব না, উল্টো ওষুধ কিনে দেব।" তাঁর এই কৌতুকপূর্ণ উৎসাহে অনেক রোগী অক্ষরজ্ঞান লাভ করেছিলেন। এছাড়াও কলেরা রোগীদের কাছ থেকে তিনি কখনো ফি নিতেন না।
চিকিৎসার পাশাপাশি সমাজসেবায় তিনি ছিলেন অগ্রগণ্য। ১৯৩০ সালে মাওলানা মনিরুজ্জামান ইসলামাবাদীর সঙ্গে মিলে প্রতিষ্ঠা করেন ‘কদম মোবারক মুসলিম এতিমখানা’। তিনি মুসলিম এডুকেশন সোসাইটি, সিটি কলেজ ও ওমরগণি এমইএস কলেজের মতো অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সচিব ও সংগঠক ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯ ৬৬-এর ছয় দফা—সবকিছুতেই প্রগতিশীল রাজনীতিকদের সুহৃদ ছিলেন তিনি।
১৯৭০ সালের ১১ আগস্ট ৭৬ বছর বয়সে এই মহৎ প্রাণের অবসান ঘটে। তাঁকে তাঁরই প্রিয় প্রাঙ্গণ কদম মোবারক এতিমখানা সংলগ্ন মসজিদে দাফন করা হয়। মৃত্যুবার্ষিকীর দীর্ঘ সময় পরও চট্টগ্রামবাসী তাঁর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জামালখান মোড়কে তাঁর নামে নামকরণ করে এই গুণী চিকিৎসকের স্মৃতিকে অমর করে রেখেছে। আজও তিনি বেঁচে আছেন সাধারণ মানুষের ভালোবাসা আর কৃতজ্ঞতায়।