বসন্তের শেষ বেলা। দখিনা বাতাসে কচি পাতার হিল্লোল আর কোকিলের কুহুতানে মুখরিত বাংলার প্রকৃতি। ঋতুরাজ বিদায়ের প্রাক্কালে চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই) চত্বরে দেখা মিলছে এক বিস্ময়কর ফুলের। লাল, গোলাপি আর হলুদের মিশ্রণে সাপের ফণার মতো আকৃতির এই ফুলটির নাম— ‘নাগলিঙ্গম’।
বিটিআরআই ক্যাম্পাসে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে বিশাল আকৃতির এই বৃক্ষটি। গাছের শরীরজুড়ে ছড়িয়ে আছে বড় বড় নয়নাভিরাম ফুল। এই ফুলের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর পরাগচক্র, যা দেখতে হুবহু ফণা তোলা সাপের মতো। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, এই আকৃতির কারণেই এর নাম হয়েছে ‘নাগলিঙ্গম’। ফুলটির রয়েছে এক প্রকার স্নিগ্ধ ও মনমাতানো সুবাস, যা দূর থেকেই পথচারীদের বিমোহিত করে।
বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মা তার ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে এই ফুলের রূপ ও গন্ধে মুগ্ধ হয়ে লিখেছিলেন, ‘আপনি বর্ণে, গন্ধে, বিন্যাসে অবশ্যই মুগ্ধ হবেন। এমন আশ্চর্য ভোরের একটি মনোহর অভিজ্ঞতা নিশ্চয়ই অনেক দিন আপনার মনে থাকবে।’
বিটিআরআই-এর উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের চিফ সায়েন্টিফিক অফিসার ড. আব্দুল আজিজ জানান, নাগলিঙ্গম একটি বিরল প্রজাতির বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Couroupita guianensis। এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকার আমাজন বনাঞ্চলে হলেও ল্যাটিন আমেরিকায় এর ব্যাপক উপস্থিতি রয়েছে। হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের কাছে এটি একটি পবিত্র বৃক্ষ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশ চা বোর্ডের তৎকালীন চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার আবদুল্লাহ আল হোসেন বিটিআরআই-তে এই চারাটি রোপণ করেছিলেন।
নাগলিঙ্গমের ফুল যেমন সুন্দর, এর ফল তেমনই বিচিত্র। বড় আকৃতির গোলাকার এই ফলগুলো দেখতে অনেকটা কামানের গোলার মতো। এ কারণেই ইংরেজিতে একে ‘ক্যানন বল’ (Cannonball) বৃক্ষ বলা হয়। এই বৃক্ষটি ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে এবং বসন্তের শেষ থেকে শুরু করে শরৎকাল পর্যন্ত এতে ফুল ফোটে।
ফুল ও ফলের সৌন্দর্যের পাশাপাশি নাগলিঙ্গমের রয়েছে বিশেষ ঔষধিগুণ। এর পাতা, ফুল ও বাকল থেকে তৈরি ওষুধ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। তবে অযত্ন আর অবহেলায় বাংলার প্রকৃতি থেকে এই বিরল বৃক্ষটি প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে। ড. আব্দুল আজিজ এই মূল্যবান ও বিরল বৃক্ষটি সংরক্ষণে বৃক্ষপ্রেমী ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
বসন্তের এই সময়ে যারা শ্রীমঙ্গলে ভ্রমণে আসছেন, তাদের কাছে বিটিআরআই-এর এই ‘নাগলিঙ্গম’ এখন অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সাপের ফণার মতো ফুল আর মৌমাছিদের গুঞ্জনে মুখরিত এই বৃক্ষটি প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি।