এম এ আর মশিউর বাগেরহাট থেকে ফিরে :
আধুনিক বাংলাদেশের উন্নয়নের নানা গল্পের মাঝেও বাগেরহাটের মোড়েলগঞ্জ উপজেলার ঘসিয়াখালী গ্রামের মানুষের জীবনযাত্রায় যেন উন্নয়নের ছোঁয়া এখনও অধরা। গ্রামে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়। রয়েছে বাজার, মসজিদ ও বসতবাড়ি। কিন্তু যোগাযোগের জন্য নেই এক হাত পিচঢালা সড়ক। নেই প্রয়োজনীয় কালভার্ট কিংবা স্থায়ী ব্রিজ। ফলে বছরের পর বছর বাঁশের সাঁকো, ভাঙাচোরা কাঠের পুল ও কাদামাটির পথই হয়ে আছে এলাকাবাসীর একমাত্র ভরসা।
রবিবার( ২৭ সেপ্টেম্বর) দুপুরে ঘসিয়াখালী গ্রামের একটি বাঁশের সাঁকো দিয়ে বই-খাতা হাতে শিক্ষার্থীদের পারাপারের দৃশ্য সরেজমিনে দেখলে এখানকার মানুষের দুর্ভোগের চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের খালের ওপর তৈরি বাঁশের সাঁকো পার হয়ে স্কুল, ও মাদ্রাসায় যেতে হয়। একটু অসতর্ক হলেই পা পিছলে খালের পানিতে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এই সাঁকো থেকে পড়ে গিয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর পানিতে তলিয়ে মৃত্যুর হৃদয়বিদারক ঘটনাও রয়েছে। শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বছরের পর বছর ধরে এই সাঁকো পার হতে গিয়ে অসংখ্য শিক্ষার্থীর বই-খাতা পানিতে পড়ে নষ্ট হয়েছে। বর্ষা ও জোয়ারের সময় পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক সময় শিক্ষার্থীরা স্কুলে যাওয়ার পথেই বই-খাতা ভিজিয়ে ফেলে। কখনও স্রোতে বই-খাতা ভেসে যায়।
স্থানীয়রা জানান, বর্তমানে যে বাঁশের সাঁকোটি দিয়ে মানুষ চলাচল করছে, সেটি কোনো সরকারি প্রকল্পের অর্থে নির্মিত নয়। এলাকার সচেতন মানুষ ও স্থানীয় বাসিন্দারা নিজেদের উদ্যোগে বাঁশ সংগ্রহ করে সাঁকোটি তৈরি করেছেন। প্রয়োজন হলে নিজেরাই সেটি মেরামত করেন। ফলে সাঁকোটির স্থায়িত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে সবসময়ই শঙ্কা থেকে যায়।
এদিকে খালের ওপর থাকা কাঠের পুলটির অবস্থাও নাজুক। এলাকাবাসীর দাবি, একসময় সরকারি উদ্যোগে কাঠের পুল নির্মাণ করা হলেও পরবর্তীতে সেটির কাঠামো বারবার বিলীন হয়ে যায়। বছরের পর বছর ধরে স্থানীয় মানুষ নিজেদের অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে ভাঙা অংশে জোড়াতালি দিয়ে কোনোভাবে চলাচলের উপযোগী রেখেছেন। কিন্তু সেটিও এখন স্থায়ী সমাধান নয়।
ঘসিয়াখালীর আরেকটি বড় সমস্যা হলো নদী ও খালের জোয়ারের পানি। টেকসই রাস্তা ও নদীর পাড়ে শক্তিশালী ভেরি বাঁধ না থাকায় জোয়ার-ভাটার সময় বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। এতে মানুষের চলাচল বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি ঘরবাড়ি, মাছের ঘের ও কৃষিজমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কর্মহীন ও খেটে খাওয়া মানুষের আয়ের ওপরও এর সরাসরি প্রভাব পড়ে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বর্ষা এলেই গ্রামের মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়ে যায়। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের স্কুলে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। অনেকে বাধ্য হয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ রাখে। এতে নিয়মিত পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। মেধাবী অনেক শিক্ষার্থীও যোগাযোগ সমস্যার কারণে সময়মতো বিদ্যালয়ে যেতে পারে না।
ঘসিয়াখালী গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর রব শিকদার বলেন, আমাদের গ্রামের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে অবহেলার শিকার। এখানে স্কুল-মাদ্রাসা আছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা করছে; কিন্তু তাদের যাতায়াতের জন্য একটি নিরাপদ সড়ক ও ব্রিজ নেই। বাঁশের সাঁকো দিয়ে প্রতিদিন শিশুদের পার হতে হয়। একটি শিশু সাঁকো থেকে পড়ে প্রাণ হারানোর ঘটনাও আমাদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক। আমরা চাই, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নিক।
ঘসিয়াখালী গ্রামের মধ্যপাড়া রেজিস্টার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বারেক শেখ বলেন, শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বর্ষা ও জোয়ারের সময় তারা অনেক কষ্ট করে বিদ্যালয়ে আসে। অনেক সময় বই-খাতা ভিজে যায়, সাঁকো পার হওয়ার সময় দুর্ঘটনার আশঙ্কা থাকে। একটি স্থায়ী ব্রিজ ও ভালো রাস্তা হলে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ও পড়াশোনার পরিবেশ অনেক উন্নত হবে।
আরেক সাবেক ইউপি সদস্য ও স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল কালাম আজাদ বলেন, এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি একটি স্থায়ী রাস্তা ও ব্রিজ। রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের মৌলিক যোগাযোগব্যবস্থার বিষয়টি দেখতে হবে। একটি ব্রিজ নির্মাণ হলে স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসার শিক্ষার্থীসহ হাজারো মানুষের দুর্ভোগ কমবে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মোস্তফা হাওলাদার বলেন, ঘসিয়াখালীর মানুষ খুব কষ্টে জীবনযাপন করেন। বাজারে মালামাল আনা-নেওয়া, রোগী পরিবহন, শিশুদের স্কুলে পাঠানো সবকিছুতেই সমস্যায় পড়তে হয়। জোয়ারের পানি উঠলে রাস্তা তলিয়ে যায়। আমরা চাই, দ্রুত একটি স্থায়ী ব্রিজ ও টেকসই রাস্তা নির্মাণ করা হোক।
এলাকাবাসীর দাবি, ঘসিয়াখালীতে একটি স্থায়ী ব্রিজ নির্মাণের পাশাপাশি রাস্তা উঁচু ও টেকসই করতে হবে। নদী ও খালের পাড়ে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণ করতে হবে, যাতে জোয়ারের পানিতে রাস্তা, ঘরবাড়ি, মাছের ঘের ও মানুষের জীবিকা বারবার ক্ষতিগ্রস্ত না হয়।
গ্রামবাসীর প্রশ্ন যেখানে প্রতিদিন শিশুরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাঁশের সাঁকো পার হয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায়, সেখানে একটি নিরাপদ ব্রিজ ও সড়ক কি তাদের মৌলিক অধিকার নয়? দীর্ঘদিনের এই দুর্ভোগের অবসানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেবে এমন প্রত্যাশাই এখন ঘসিয়াখালীবাসীর।